মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ছায়া-সাম্রাজ্য

১৯ ঘাঁটি, ৪০ হাজার সেনা ও অদৃশ্য আধিপত্য

0 comments 190 views

মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির বিস্তার এক বিশাল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৯টি সামরিক ঘাঁটি সক্রিয় রয়েছে, যেখানে প্রতিনিয়ত কাজ করছে প্রায় ৪০ হাজার সামরিক ও বেসামরিক মার্কিন নাগরিক। এসব ঘাঁটি শুধু যুদ্ধের প্রস্তুতি বা অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয় না, বরং এগুলো মার্কিন আধিপত্যের সরাসরি প্রতিফলন, যার মাধ্যমে তারা তেলসমৃদ্ধ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে চায়। ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান, ইসলামিক স্টেট ও আল কায়েদার মতো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই এবং ইরানকে প্রতিহত করার কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে এই সামরিক কাঠামো।

এই ঘাঁটিগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহত্তম হলো কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্ট্রাল কমান্ড’ (সেন্টকম)-এর ফরওয়ার্ড হেডকোয়ার্টার অবস্থিত। এখানে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং অতীতে ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযান পরিচালনায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গত মে মাসে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ঘাঁটির রানওয়েতে সি-১৩০ হারকিউলিস ও রেকোননাইসেন্স প্লেনসহ প্রায় ৪০টি সামরিক বিমান অবস্থান করছিল। কিন্তু ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা প্রতিক্রিয়ার শঙ্কায় মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সেখানকার বিমান সংখ্যা নেমে আসে তিনটিতে। এ থেকেই স্পষ্ট, এই ঘাঁটিতে যে কোনো সময় অপারেশন চালানোর প্রস্তুতি যেমন থাকে, তেমনি ঝুঁকি মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক কৌশল পরিবর্তনেরও ক্ষমতা রয়েছে।

US withdraws jets from Al-Udeid Airbase over Iranian strike fears

কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি

বাহরাইন হলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম কৌশলগত ঘাঁটি। এখানে অবস্থিত ‘নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটি বাহরাইন’ হলো যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতর, যার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর ও পূর্ব আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চল। প্রায় নয় হাজার মার্কিন নৌসেনা এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রে মোতায়েন রয়েছে। এই ঘাঁটিতে মোতায়েন রয়েছে ইউএসএস কার্ল ভিনসনের মতো সুপারক্যারিয়ার, চারটি মাইন ক্লিয়ারেন্স ভেসেল, দু’টি লজিস্টিক জাহাজ এবং ছয়টি র‍্যাপিড রেসপন্স বোট। এই নৌঘাঁটির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র শুধু পারস্য উপসাগরের তেল রুট রক্ষা করে না, বরং ইরানকে ঘিরে রাখার কৌশল বাস্তবায়ন করে।

NSA Bahrain Carries Premiere Support To Carrier > United States Navy >  display-pressreleases

বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর

কুয়েত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সরবরাহ ও অপারেশন পরিচালনার অন্যতম ঘাঁটি। এখানে অবস্থিত ক্যাম্প আরিফজান হলো মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর অপারেশনাল ও লজিস্টিকাল হাব। এই ঘাঁটিতে প্রচুর সরঞ্জাম মজুদ রয়েছে, যা যুদ্ধ বা অভিযানের সময় দ্রুত মোতায়েনের সুযোগ দেয়। কুয়েতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি আলী আল সালেম বিমান ঘাঁটি, যেখানে রয়েছে ৩৮৬তম এয়ার এক্সপিডিশনারি উইং এবং এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন। শুধুমাত্র এই দুইটি ঘাঁটিতে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।

Camp Arifjan Kuwait Army Base

ক্যাম্প আরিফজান, কুয়েত

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আল ধাফরা ঘাঁটি মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা তৎপরতা ও আকাশযুদ্ধের জন্য ব্যবহৃত হয়। এখানে মোতায়েন রয়েছে ৩৮০তম এয়ার এক্সপিডিশনারি উইং, যা দশটি বিমান স্কোয়াড্রনের সমন্বয়ে গঠিত। এই স্কোয়াড্রনে রয়েছে ড্রোন, নজরদারি বিমান ও কমব্যাট এয়ার ইউনিট। পারস্য উপসাগরের আকাশপথে কৌশলগত দিক থেকে এই ঘাঁটিটির গুরুত্ব অপরিসীম।

DVIDS - Images - Al Dhafra Air Base provides mass support for non-combatant  evacuations in Afghanistan [Image 2 of 11]

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল ধাফরা ঘাঁটি

ইরাকে, সাদ্দাম হোসেন পতনের সময় যুক্তরাষ্ট্র মোতায়েন করেছিল ১ লক্ষ ৬০ হাজারের বেশি সেনা, প্রায় ৫০০টি ঘাঁটিতে। বর্তমানে সেখানে মার্কিন সেনার সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে আড়াই হাজারে। বর্তমানে ইরাকের আল আসাদইরবিল বিমান ঘাঁটি থেকেই যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। যদিও ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে অভিযানের লক্ষ্যেই এসব বাহিনী মোতায়েন, তবু বাস্তবে ইরানঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে মার্কিন ঘাঁটিগুলো।

সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ছিল ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কারণে। ২০১১ সালে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের সময় থেকে সিরিয়ার বিভিন্ন অংশে মার্কিন ঘাঁটি গড়ে ওঠে। কিছু সময় আগে এসব ঘাঁটির সংখ্যা ছিল আটটি, যা এখন কমিয়ে আনা হয়েছে একটিতে। বর্তমানে সেখানে প্রায় দুই হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। ২০২৪ সালের শেষভাগে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর নতুন শাসক আহমেদ শারারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা শুরু করেছে।

উল্লেখযোগ্য যে, যদিও জিবুতি ও তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে, তবু মার্কিন সামরিক কার্যক্রমে এই দুটি ঘাঁটিকে প্রায়ই কৌশলগত অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আফ্রিকার শিং বা হর্ন অব আফ্রিকার জিবুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ড্রোন বেস ও গোয়েন্দা ঘাঁটি রয়েছে। তুরস্কের ইনজারলিক ঘাঁটি ব্যবহার করা হয় সিরিয়া ও ইরাকের অভিযানে সহায়তার জন্য।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি অনেক পুরনো হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা, হুথিদের হামলা ও গাজা যুদ্ধের পর আবারও তা নতুন মাত্রা পেয়েছে। যদিও কিছু ঘাঁটিতে সেনা বা বিমান প্রত্যাহার চলছে নিরাপত্তার কারণে, তবু সামগ্রিকভাবে এটি স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্র এখনও এই অঞ্চলে নিজের সামরিক আধিপত্য বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই ঘাঁটিগুলো শুধু অস্ত্রশস্ত্রের জড় সমাহার নয়, বরং ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের এক সুপরিকল্পিত ছক, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক কৌশল বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

Leave a Comment

About Us

সম্পাদক: মোহাম্মদ আলমগীর

©2025 – All Right Reserved To NJ Bangla world. 

Powered BY  Milestone