
চট্টগ্রামের বাকলিয়া একসময় ছিল নদীবেষ্টিত ঐতিহ্যবাহী এক জনপদ। কিন্তু বর্তমানে এটি যেন পরিণত হয়েছে অপরাধ, মাদক, কিশোর গ্যাং ও অব্যবস্থাপনার এক ঘনঘোর অরণ্যে। ১২.১৩ বর্গ কিলোমিটারের এই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার জনসংখ্যা প্রায় ২.৬২ লক্ষ। নগর পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব চিত্র ভয়াবহ: এখানে জনজীবন আজ নিরাপত্তাহীনতায় স্তব্ধ, ব্যবসায়ী আতঙ্কগ্রস্ত, শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত এবং অভিভাবকরা চিন্তিত।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১৭, ১৮, ১৯ ও ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মাদক স্পট। বউবাজার, নূর বক্স সওদাগরের বাড়ি, শাহ আমানত হাউজিং সোসাইটি, বগারবিল, বড় কবরস্থান, মিয়াখান সড়ক, কালামিয়া বাজার, কল্পলোক আবাসিক এলাকা, স্লুইস গেট এলাকা, ওমর আলী মাতব্বর রোড়, ফুলতলা, খালপাড়, সৈয়দ শাহ রোড, কালাম কলোনি, মিয়াখান নগর, ডিসি রোড, রসুলবাগ — সবখানেই অলিগলিতে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলের অবাধ বিকিকিনি। অথচ এসব চোখে পড়ে না পুলিশের? না কি এসবের নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া? স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নির্লিপ্ততা এই চক্রকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
বাকলিয়ার মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে কয়েকটি ভয়ংকর কিশোর গ্যাং। সোবহান, বাদশা, সাজ্জাদ, করিম, সাইফুল – এদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি সুসংগঠিত অপরাধ নেটওয়ার্ক। এই চক্র শুধু মাদক নয়, খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও নারী নির্যাতনের সাথেও যুক্ত। গত ৮ জুন এক ভয়াবহ সংঘর্ষে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় আহত হয় একসময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোরশেদ খান ও তার সহযোগীরা। রাহাত্তারপুলের আলী স্টোর বিল্ডিং সংলগ্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় পরিষ্কার হয়ে গেছে – এখানকার মাদকের নিয়ন্ত্রণ এখন কেড়ে নিতে লেগেছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।

এই বছরেই জানুয়ারিতে সিগারেট এনে না দেওয়ায় ৭৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ নৈশপ্রহরীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে এক যুবক। মে মাসে ডাবল মার্ডার মামলার প্রধান আসামি মেহেদী হাসান ধরা পড়ে বিদেশি পিস্তলসহ। অন্যদিকে, রুপালি রঙের একটি প্রাইভেট কারে সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণের ঘটনায় নিহত হন বখতিয়ার নামের এক যুবক। এই ঘটনায় সাজ্জাদ ও তার স্ত্রীসহ ৭ জনের নামে মামলা হয়েছে। এ যেন কেবল বাকলিয়ারই নয়, গোটা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আয়না।

বাকলিয়ার অপরাধচক্র শুধু মাদকে সীমাবদ্ধ নয়; রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠেছে একটি অদৃশ্য শক্তি। প্রশাসনের কোনো অংশ হয়তো এই সব নেতাদের সঙ্গে জড়িত, না হয় নিরব দর্শক। মাদক স্পটে নিয়মিত অভিযান নেই, সিসি ক্যামেরা অচল, মাদকসেবীরা দিনে-দুপুরে চলাফেরা করে নির্ভয়ে — এসবই স্পষ্ট করে দেয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা।
এইসব ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। বরং, এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়। মাদকের এই অবাধ প্রবাহ শুধু একজনকে নয়, পুরো প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। বিদ্যালয়গামী কিশোরদের হাতে এখন বইয়ের চেয়ে বেশি দেখা যায় ইয়াবার প্যাকেট। সামাজিক দায়বদ্ধতার বদলে তারা ছুটছে অস্ত্র আর আধিপত্যের রাজনীতিতে।
প্রশাসনকে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে — শুধু “অভিযান চলছে” মর্মে বিবৃতি দিলেই হবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দায় নিতে হবে, এলাকাবাসীকেও সচেতন হতে হবে। চট্টগ্রাম মহানগরীর এই প্রাণকেন্দ্র আজ যদি অপরাধের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তবে আগামীতে অন্য এলাকাও ঝুঁকিতে পড়বে।